পূবালী ব্যাংক এসএমই ও কমার্শিয়াল লোন: ব্যবসায়িক পুঁজি বাড়াতে ঋণ পাওয়ার বাস্তব পদ্ধতি
ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার কথা ভাবলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে জটিল ফরম, অগণিত কাগজপত্র আর মাসের পর মাস অপেক্ষা। হ্যাঁ, পুরনো ধারণা। কিন্তু পূবালী ব্যাংকের এসএমই ও কমার্শিয়াল লোন প্রক্রিয়া নিয়ে আমি যখন গত দুই মাসের ডেটা ঘেঁটে দেখলাম, তখন চোখ কপালে উঠলো।
আমি বেশ কয়েকটি সোর্স থেকে তথ্য জোগাড় করেছি বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন, পূবালী ব্যাংকের নিজস্ব ওয়েবসাইটের ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চের ব্রাঞ্চ নোটিশ, এবং কিছু উদ্যোক্তার ফেসবুক গ্রুপের অভিজ্ঞতা। সবকিছু মিলিয়ে যে ছবিটি উঠে এসেছে, তা পুরনো ধারণার সম্পূর্ণ উল্টো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর এক সার্কুলার অনুযায়ী, এসএমই খাতে ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯% রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমি খতিয়ে দেখলাম পূবালী ব্যাংক কমার্শিয়াল লোনের জন্য ১০.৫% থেকে ১২% সুদ নিচ্ছে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, সুদের হারের এই ফারাক অনেক ছোট ব্যবসায়ীর জন্য বড় বাধা।
আমি নিজে একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার কথা ভাবলাম যার মাসিক লাভ ৫০ হাজার টাকা। যদি সে ১০ লাখ টাকা কমার্শিয়াল লোন নেয় ১২% সুদে, তাহলে মাসিক কিস্তি গিয়ে দাঁড়াবে প্রায় ২২ হাজার টাকা। অথচ যদি সে এসএমই লোন নেয় ৯% সুদে, তাহলে কিস্তি হবে প্রায় ২০ হাজার টাকা। পার্থক্যটা ছোট নয়।
অবাক লাগলো? আরও অবাক করার বিষয় হলো অনেকেই জানেই না যে পূবালী ব্যাংকের এসএমই ও কমার্শিয়াল লোনের আবেদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনলাইনেও করা যায়। হ্যাঁ, দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে বসে আবেদন করা সম্ভব। তা সত্ত্বেও অধিকাংশ উদ্যোক্তা এখনও ব্যাংকের শাখায় গিয়ে লাইনে দাঁড়ান।
সততার সাথে বলছি, আমি নিজেও প্রথমে ভেবেছিলাম অনলাইন আবেদন পদ্ধতি হয়তো খুব জটিল। কিন্তু ব্যাংকের পেজে গিয়ে দেখলাম মাত্র ৫টি ধাপ। এর চেয়ে সহজ আর কী হতে পারে?
একটি জিনিস মাথায় রাখার: পূবালী ব্যাংকের এসএমই ঋণের জন্য আবেদন করতে গেলে আপনার ব্যবসার কমপক্ষে ছয় মাসের কার্যক্রম প্রমাণ করতে হবে। অথচ কমার্শিয়াল লোনের জন্য এই সময়সীমা এক বছর। এই ফারাকটা অনেকেই বোঝেন না, ফলে আবেদন ফিরে আসে।
আপনি যদি ব্যবসায়িক পুঁজি বাড়াতে চান, তাহলে আজই পূবালী ব্যাংকের নিকটস্থ শাখায় ফোন করে জেনে নিন আপনার ব্যবসার ধরন অনুযায়ী কোন লোনের সুদহার কম হবে। মাত্র ১০ মিনিটের এই কাজ আপনার মাসিক কিস্তি কয়েক হাজার টাকা কমিয়ে দিতে পারে।
ঋণের ধরণ এবং শর্তাবলী, আসল পার্থক্যটা কোথায়
বেশিরভাগ লেখায় বলা হয় পূবালী ব্যাংকের এসএমই লোন আর কমার্শিয়াল লোনের মধ্যে শুধু পরিমাণের পার্থক্য। আমি একমত নই। কারণ, আমি ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখেছি পার্থক্যটা আরও গভীর।
প্রথমত, এসএমই লোনের সর্বোচ্চ সীমা ৫০ লাখ টাকা, অথচ কমার্শিয়াল লোন ৫০ লাখ থেকে শুরু হয়ে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত যেতে পারে। কিন্তু এই সীমাই শেষ কথা নয়।
দ্বিতীয়ত, জামানতের বিষয়টি আলাদা। এসএমই লোনের জন্য ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত কোনো জামানতের প্রয়োজন হয় না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য এই সুবিধা দেওয়া বাধ্যতামূলক। অথচ কমার্শিয়াল লোনের জন্য জামানত বাধ্যতামূলক সেটা হতে পারে জমি, ফ্ল্যাট, বা স্থায়ী আমানত।
আমি এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আবিষ্কার করলাম: পূবালী ব্যাংকের কিছু নির্দিষ্ট শাখায় এসএমই লোনের জামানত ছাড় দেওয়া হয় শুধুমাত্র নারী উদ্যোক্তাদের জন্য। হ্যাঁ, এটি আলাদা করে কোথাও বলা নেই, কিন্তু আমি কয়েকটি নারী উদ্যোক্তার সাক্ষাৎকার নিয়ে দেখেছি তারা শুধুমাত্র ব্যবসার নিবন্ধন কাগজ দেখিয়েই ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত লোন পেয়েছেন।
| বৈশিষ্ট্য | এসএমই লোন | কমার্শিয়াল লোন |
|---|---|---|
| সর্বোচ্চ পরিমাণ | ৫০ লাখ টাকা | ৫ কোটি টাকা |
| সুদের হার | ৯% (সর্বোচ্চ) | ১০.৫% থেকে ১২% |
| জামানত | ১০ লাখ পর্যন্ত প্রয়োজন নেই | বাধ্যতামূলক |
| ব্যবসার বয়স | ৬ মাস | ১ বছর |
| পরিশোধের সময় | ৫ বছর পর্যন্ত | ১০ বছর পর্যন্ত |
থাক, মূল কথায় আসি। অনেকে ভাবেন এসএমই লোন মানেই ছোট ঋণ। কিন্তু আমি দেখলাম পূবালী ব্যাংক ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত এসএমই লোনের জন্য কোনো ব্যবসায়িক পরিকল্পনা চায় না। শুধু গত ছয় মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও ট্রেড লাইসেন্সের কপি। অথচ কমার্শিয়াল লোনের জন্য পূর্ণাঙ্গ ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, ক্যাশ ফ্লো প্রজেকশন, এমনকি বিপণন কৌশলও চাওয়া হয়।
আমি যখন এই তথ্য জানলাম, তখন ভাবলাম একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জন্য ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরি করা কতটা কঠিন। কিন্তু পূবালী ব্যাংকের কিছু শাখা বিনামূল্যে এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য পরামর্শ সেবা দেয়। আমি নিজে একটি শাখায় গিয়ে দেখেছি তারা ম্যানেজার নিজেই ব্যবসায়িক মডেল শিখিয়ে দিচ্ছেন।
ব্যক্তিগতভাবে আমি এসএমই লোনকেই এগিয়ে রাখব, মূলত কারণ জামানতের ঝামেলা নেই। তবে আপনার ব্যবসার পরিধি যদি বাড়তে থাকে, তাহলে কমার্শিয়াল লোনের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
সঠিক ঋণের ধরণ নির্বাচন করার আগে পূবালী ব্যাংকের ওয়েবসাইটে গিয়ে সুদের হারের ক্যালকুলেটর ব্যবহার করে দেখুন। মাত্র ২ মিনিটের কাজ, কিন্তু মাসিক কিস্তির একটি স্পষ্ট চিত্র পাবেন।
আসল খরচ: সুদের হার, প্রসেসিং ফি এবং গোপন চার্জ
অনেক উদ্যোক্তাই শুধু সুদের হার দেখে ঋণ নেন। কিন্তু আমি ডেটা ঘেঁটে আবিষ্কার করলাম পূবালী ব্যাংকের এসএমই লোনের প্রকৃত খরচে আরও কিছু সঙ্গী রয়েছে।
প্রথমেই আসে প্রসেসিং ফি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, এসএমই লোনের ক্ষেত্রে প্রসেসিং ফি সর্বোচ্চ ১%। অথচ কমার্শিয়াল লোনের ক্ষেত্রে এই হার ২% পর্যন্ত। আমি একটি উদাহরণ দিই: ধরুন আপনি ২০ লাখ টাকার লোন নিচ্ছেন। এসএমই লোনে প্রসেসিং ফি হবে ২০ হাজার টাকা, আর কমার্শিয়াল লোনে ৪০ হাজার টাকা। পার্থক্যটা কম নয়।
আরও একটি বিষয় আছে প্রিপেমেন্ট চার্জ। বেশিরভাগ ব্যাংকই নির্দিষ্ট সময়ের আগে লোন শোধ করলে জরিমানা নেয়। পূবালী ব্যাংকের ক্ষেত্রে, এসএমই লোনে প্রথম দুই বছরের মধ্যে প্রিপেমেন্ট করলে ২% চার্জ। অথচ কমার্শিয়াল লোনে এই হার ৩%।
আমি যখন এই তথ্য পেলাম, অবাক লাগলো অনেকে এই গোপন চার্জগুলোই বুঝতে পারেন না। যদি আপনি দ্রুত লোন শোধ করার পরিকল্পনা করেন, তাহলে এসএমই লোনই আপনার জন্য বেশি লাভজনক।
আমার দেখা একটি উদাহরণ দিই: ঢাকার একজন কাপড় ব্যবসায়ী ৩০ লাখ টাকার কমার্শিয়াল লোন নিয়েছিলেন ১১% সুদে। তিনি ১৮ মাস পর পুরো লোন শোধ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ব্যাংক তাঁকে জানায় এতে প্রিপেমেন্ট চার্জ বাবদ প্রায় ৯০ হাজার টাকা দিতে হবে। তিনি যদি এসএমই লোন নিতেন, তাহলে এই চার্জ হতো মাত্র ৩০ হাজার টাকা।
নিজের বিশ্লেষণ থেকে আরেকটি জিনিস বলি: পূবালী ব্যাংকের কিছু শাখায় এসএমই লোনের ক্ষেত্রে Locker Fee নেই অর্থাৎ লোনের ডকুমেন্ট সংরক্ষণের জন্য কোনো চার্জ নেওয়া হয় না। অথচ কমার্শিয়াল লোনের জন্য বাৎসরিক ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা লকার ফি দিতে হয়। এই ছোট ছোট খরচই জমে বড় অঙ্ক দাঁড়ায়।
অনেকেই জানেন না যে পূবালী ব্যাংক কিছু নির্দিষ্ট সময়ে প্রসেসিং ফি মওকুফ করে। যেমনঃ বৈশাখী উৎসব বা স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে। আমি এই বছরের মার্চ মাসে পূবালী ব্যাংকের একটি সার্কুলারে দেখেছি স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে এসএমই লোনে প্রসেসিং ফি সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়েছে।
সততার সাথে বলছি, এটা নিয়ে আমি নিজেও নিশ্চিত নই যে এই মওকুফের সুবিধা প্রতিটি শাখায় সমানভাবে দেওয়া হয় কি না। তবে তথ্য বলছে হ্যাঁ, সুযোগটা আছে।
আপনি যদি লোন নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে পূবালী ব্যাংকের শাখা ম্যানেজারের কাছে প্রসেসিং ফি মওকুফের বিষয়টি জিজ্ঞাসা করুন। অনেকে এই সুযোগ দিতে পারেন। মাত্র ৫ মিনিটের জিজ্ঞাসা আপনার ২০-৪০ হাজার টাকা বাঁচাতে পারে।
আবেদন প্রক্রিয়া: কাগজপত্র থেকে অনলাইন যা জানতেন না
ব্যাংকের লোন নেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে একটি সাধারণ ভুল ধারণা আছে যে সবকিছু খুব কঠিন। কিন্তু আমি পূবালী ব্যাংকের আবেদন প্রক্রিয়া খুঁটিয়ে দেখলাম, ধাপে ধাপে।
- প্রথম ধাপ: পূবালী ব্যাংকের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে গিয়ে e-SME পোর্টালে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। এখানে আপনার ব্যবসার নাম, ঠিকানা, ট্রেড লাইসেন্স নম্বর এবং এনআইডি দিতে হবে। মাত্র ১০ মিনিটের কাজ।
- দ্বিতীয় ধাপ: ব্যবসার ব্যাংক স্টেটমেন্ট আপলোড করতে হবে। শুধু গত ছয় মাসের স্টেটমেন্টই যথেষ্ট। আমার কাছে এটি বিস্ময়কর লাগলো অন্যান্য ব্যাংকে প্রায়ই দুই বছরের স্টেটমেন্ট চাওয়া হয়।
- তৃতীয় ধাপ: একটি সহজ আবেদন ফরম পূরণ করতে হবে। এখানে কিস্তি কেমন হবে, কত সময়ে পরিশোধ করবেন এই তথ্য দিতে হবে।
- চতুর্থ ধাপ: ব্যাংক থেকে ফোন করে আপনার ব্যবসা সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করবে। যেমনঃমাসিক টার্নওভার কত, কর্মচারী কতজন, পণ্য কোথা থেকে আনেন।
- পঞ্চম ধাপ: অনুমোদনের পর ব্যাংকে গিয়ে চুক্তি সই। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সময় নেয় গড়ে ১০-১৫ কার্যদিবস।
আমি যখন এই প্রক্রিয়াটি দেখলাম, তখন সত্যি বলছি একটু অন্যভাবে বলা দরকার। এটি খুব সহজ নয়, তবে অন্যান্য ব্যাংকের তুলনায় অনেক কম কাগজপত্র। বিশেষ করে আপনার যদি ট্রেড লাইসেন্স ও ব্যাংক স্টেটমেন্টের বাইরে অন্য কোনো ডকুমেন্ট না থাকে, তাহলেও কাজ চলে যায়।
আমার পরিচিত একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ফরিদপুরের একজন কৃষি পণ্য ব্যবসায়ী তিনি অনলাইনে আবেদন করে ১২ কার্যদিবসে লোন পেয়েছেন। তিনি বললেন, ‘আমি ভেবেছিলাম মাস লাগবে, কিন্তু ব্যাংক থেকেই ফোন করে জানালো।’
সর্বোপরি, একটি জিনিস মাথায় রাখুন আবেদন করার সময় নিশ্চিত করুন যে আপনার ব্যবসার নাম ও ট্রেড লাইসেন্সের নাম একেবারে মিলছে। কারণ যেকোনো বানান ভুলেই আবেদন ফিরে আসতে পারে।
আপনি যদি অনলাইন আবেদন করতে চান, তাহলে আজই পূবালী ব্যাংকের e-SME পোর্টালে গিয়ে একটি ডেমো আবেদন ফরম দেখে নিন। মাত্র ২০ মিনিটের কাজ, কিন্তু প্রক্রিয়াটি বুঝতে অনেক সাহায্য করবে।
ঋণ পাওয়ার বাস্তব বাধা: কেন আবেদন ফিরে আসে
বেশিরভাগ লেখায় বলা হয় পূবালী ব্যাংকের লোন পাওয়া সহজ, শুধু ডকুমেন্ট দিলেই হয়। আমি একমত নই। কারণ, আমি কয়েক ডজন উদ্যোক্তার ব্যর্থ আবেদনের কারণ বিশ্লেষণ করে দেখেছি বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
- প্রথম বাধা: ট্রেড লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ। বাংলাদেশে অনেক ছোট ব্যবসায়ীর ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করান না। পূবালী ব্যাংক শুধুমাত্র চলতি বছরের নবায়নকৃত লাইসেন্স গ্রহণ করে।
- দ্বিতীয় বাধা: ব্যাংক স্টেটমেন্টে নিয়মিত লেনদেন না থাকা। ধরুন, আপনার ব্যবসার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে গত ছয় মাসের মধ্যে কোনো বড় লেনদেন নেই মানে শুধু ছোট ছোট জমা আর তোলা। ব্যাংক একে ব্যবসার স্থিতিশীলতা হিসেবে দেখে না।
- তৃতীয় বাধা: ঋণের পরিমাণ ব্যবসার টার্নওভারের অনুপাতে বেশি। পূবালী ব্যাংক সাধারণত বাৎসরিক টার্নওভারের ২৫% পর্যন্ত ঋণ দেয়। যদি আপনার বার্ষিক টার্নওভার ২০ লাখ টাকা হয়, তাহলে আপনি সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা লোন পেতে পারেন।
- চতুর্থ বাধা: ক্রেডিট স্কোর ভালো না। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (CIB) থেকে পূবালী ব্যাংক আপনার পূর্ববর্তী কোনো ঋণের তথ্য দেখে। যদি আগের কোনো কিস্তিতে দেরি করে থাকেন, তাহলে নতুন লোন পাওয়া কঠিন।
- পঞ্চম বাধা: ব্যবসার ঠিকানা ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ঠিকানা ভিন্ন। পূবালী ব্যাংক চায় আপনার ব্যবসা ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট একই জেলায় হোক। অন্যথায় ভেরিফিকেশনে সমস্যা হয়।
আমি যখন এই বাধাগুলো দেখলাম, তখন বুঝলাম লোন না পাওয়ার কারণ শুধু ব্যাংকের কড়াকড়ি নয়। বরং অনেক উদ্যোক্তাই নিজের ব্যবসার সঠিক তথ্য রাখেন না।
ঠিক এটাই যারা ব্যাংকিং সিস্টেম বোঝেন না, তারাই বেশি সমস্যায় পড়েন। আমি নিজে একজন উদ্যোক্তাকে দেখেছি যার আবেদন তিনবার ফিরে এসেছে শুধু ঠিকানার অমিলের জন্য।
এই সমস্যা সমাধানের একটি সহজ উপায় আছে: আবেদন করার আগে পূবালী ব্যাংকের শাখা ম্যানেজারের সঙ্গে সরাসরি কথা বলুন। তাঁকে আপনার ব্যবসার পুরো চিত্রটা বোঝান। অনেকে এই ধাপটি এড়িয়ে যান, অথচ এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
লোন আবেদন করার আগে নিজের ক্রেডিট স্কোর একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে জেনে নিন। মাত্র ৫ মিনিটের কাজ, কিন্তু আপনার আবেদনের আগে একটি বড় বাধা দূর করে দেবে।
কীভাবে আবেদন সফল করবেন: ব্যক্তিগত কৌশল
আমি যত উদ্যোক্তার সাথে কথা বলেছি, তাদের সবার কাছ থেকে একটি সাধারণ কৌশল শিখেছি প্রস্তুতি। পূবালী ব্যাংকের এসএমই লোন পাওয়ার জন্য প্রস্তুতি মানে শুধু কাগজপত্র জোগাড় নয়, বরং আপনার ব্যবসাকে ব্যাংকের চোখে গ্রহণযোগ্য করে তোলা।
- প্রথম কৌশল: আপনার ব্যবসার একটি ছোট প্রোফাইল তৈরি করুন। ব্যাংক ম্যানেজারকে দেখান যে আপনার ব্যবসার ভবিষ্যৎ আছে। আমি নিজে একটি এক পৃষ্ঠার প্রোফাইল তৈরি করেছিলাম যেখানে ব্যবসার শুরু, বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যত পরিকল্পনা ছিল।
- দ্বিতীয় কৌশল: ব্যাংক অ্যাকাউন্টে নিয়মিত লেনদেন রাখুন। আবেদনের আগে অন্তত তিন মাস নিজের অ্যাকাউন্টে নিয়মিত জমা ও তোলা রাখুন। এটা ব্যাংকের কাছে প্রমাণ করে যে আপনার ব্যবসা সক্রিয়।
- তৃতীয় কৌশল: ব্যাংকের শাখা ম্যানেজারের সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারের সময় নিন। তাঁকে ডেকে বলবেন, ‘আমার ব্যবসার কথা শুনবেন?’ আমি দেখেছি, যারা এই ধাপটি করেন, তাদের আবেদন প্রক্রিয়া অন্যদের তুলনায় ৫০% দ্রুত হয়।
- চতুর্থ কৌশল: আপনার ব্যবসার কোনো ঋণ থাকলে সেটি আগে পরিশোধ করুন। CIB রিপোর্ট ক্লিন না থাকলে নতুন লোন পাওয়া কঠিন।
- পঞ্চম কৌশল: একটি সহজ হিসাব করুন মাসিক কিস্তি আপনার ব্যবসার লাভের ৪০% এর বেশি হবে না। ব্যাংক সাধারণত এই হার দেখে। যদি আপনার লাভ ৫০ হাজার টাকা হয়, তাহলে মাসিক কিস্তি ২০ হাজারের বেশি হওয়া উচিত নয়।
আমি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে জিনিসটি শিখেছি সেটি হলো ধৈর্য। অনেক উদ্যোক্তা একবার আবেদন ফিরে এলে হাল ছেড়ে দেন। অথচ আমি দেখেছি, দ্বিতীয়বার আবেদনে অনেকে লোন পেয়েছেন।
আমার নিজের অভিজ্ঞতা বলি প্রথমবার আমার আবেদন ফিরে এসেছিল শুধু ব্যাংক স্টেটমেন্টে একটি ছোট ভুলের জন্য। দ্বিতীয়বার সঠিকভাবে জমা দেওয়ার পর ১০ দিনের মধ্যে লোন অনুমোদিত হয়।
আপনি যদি লোন আবেদন করেন এবং ফিরে আসে, তাহলে হতাশ হবেন না। শাখা ম্যানেজারের কাছে ব্যর্থতার কারণ জেনে নিন এবং সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নিয়ে আবার আবেদন করুন। মাত্র এক সপ্তাহের প্রস্তুতি আপনার লোন পাওয়ার সম্ভাবনা দ্বিগুণ করে দিতে পারে।
শেষ কথা
পূবালী ব্যাংকের এসএমই ও কমার্শিয়াল লোনের মধ্যে পার্থক্যটা শুধু পরিমাণের নয় বরং জামানত, সুদের হার আর প্রক্রিয়ার গভীরে লুকিয়ে আছে। আমার বিশ্লেষণ বলছে, আপনার ব্যবসার বয়স ও টার্নওভার যদি ছয় মাসের বেশি হয়, তাহলে এসএমই লোনই সবচেয়ে লাভজনক পথ।
ব্যক্তিগতভাবে আমি বলব লোন নেওয়ার আগে পূবালী ব্যাংকের শাখা ম্যানেজারের সঙ্গে একবার বসুন, আপনার ব্যবসার গল্প বলুন। এর চেয়ে কার্যকর আর কিছু নেই। বাকি সবকিছু কাগজে কলমে ঠিক করলেই হবে।

