আমার প্রবাসী বন্ধু জাকারিয়া যেভাবে তাঁর পরিবারের জন্য ব্রাক ব্যাংক থেকে স্বাবলম্বী এসএমই লোন নিয়েছিল
জাকারিয়ার সাথে আমার পরিচয় বছর দশেক আগের। সে তখন সৌদি আরবে নির্মাণকাজে যুক্ত, আর তার বাবা-মা দেশে একটা ছোট মুদিখানার দোকান চালিয়ে সংসার টেনে রাখছেন। প্রতি মাসে রেমিটেন্স পাঠালেও সংসারের চাকা ঠিকমতো ঘুরছিল না। একটা স্থায়ী আয়ের উৎস তৈরি করতে না পারলে পুরো পরিবারটাই সবসময় জাকারিয়ার একার আয়ের উপর নির্ভরশীল থাকবে।
সেই সমস্যার সমাধান হলো ব্র্যাক ব্যাংকের স্বাবলম্বী লোন প্রকল্পের মাধ্যমে। ব্রাক ব্যাংকের স্বাবলম্বী লোন প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য দেখে আমার খুবই অবাক লাগলো! যেন এই লোন পণ্যটা ঠিক জাকারিয়ার মতো পরিবারের জন্যই তৈরি করেছে ব্রাক ব্যাংক।
স্বাবলম্বী লোন আসলে কী, এবং কেন এটা প্রবাসী পরিবারের জন্য আলাদা
বেশিরভাগ লেখায় বলা হয় ব্র্যাক ব্যাংকের এসএমই লোন শুধু ব্যবসায়ীদের জন্য। আমি একমত নই, কারণ এই ব্যাংকের ‘স্বাবলম্বী’ পণ্যটি মূলত একটি ভিন্ন শ্রেণির মানুষের জন্য তৈরি। স্বাবলম্বী হলো একটি লোন সুবিধা যা বিশেষভাবে রেমিটেন্স উপার্জনকারীদের পরিবারের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। ঠিক এটাই। জাকারিয়ার মা দোকান চালান, বাবা অসুস্থ, পরিবারটির একটি মূলধন দরকার ছিল যেটা দিয়ে ব্যবসাটা বড় করা যাবে।
ব্র্যাক ব্যাংক বাংলাদেশে এসএমই ব্যাংকিংয়ের পথিকৃৎ হিসেবে জামানতবিহীন ঋণে সর্বনিম্ন ১৩.৭৫ শতাংশ সুদের হার নিয়ে এসেছে, যা দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা অর্থায়ন খাতে সর্বনিম্ন। ২০২৬ সালের হিসাবে এই হার প্রতিযোগিতামূলক বাজারে অত্যন্ত আকর্ষণীয় একটি প্রস্তাব। ২৪ বছরের কার্যক্রমে ব্যাংকটি ২০ লাখ এসএমই গ্রাহকসেবার মাইলফলক স্পর্শ করেছে এবং সারা দেশের উদ্যোক্তাদের কাছে ২ লাখ কোটি টাকার এসএমই ঋণ বিতরণ করেছে। এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি সংখ্যার পেছনে জাকারিয়ার মতো হাজারো পরিবারের স্বপ্ন আছে।
স্বাবলম্বী লোনের পরিমাণ ব্যবসার চাহিদার উপর ভিত্তি করে ২ লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। জাকারিয়ার পরিবার শেষ পর্যন্ত ৫ লাখ টাকার লোনের জন্য আবেদন করেছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল মুদিখানার পাশাপাশি একটি ছোট মুরগি পালনের খামার শুরু করা।
আচ্ছা ধরুন, আপনার পরিবারের কেউ প্রবাসে আছেন। সে প্রতি মাসে টাকা পাঠাচ্ছে, কিন্তু আপনি একটি নিজস্ব আয়ের উৎস চান। তাহলে এই লোনটি আপনার জন্যই।
যদি স্বাবলম্বী লোনের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চান, তাহলে আজই নিকটস্থ ব্র্যাক ব্যাংক এসএমই ইউনিট অফিসে গিয়ে একটি পরামর্শ বৈঠক করুন। মাত্র ৩০ মিনিটের কথাবার্তায় আপনি বুঝতে পারবেন আপনার পরিবার আবেদনের যোগ্য কিনা।
জাকারিয়ার পরিবার যেভাবে আবেদনের যোগ্যতা যাচাই করেছিল
সত্যি কথা বলতে, প্রথমে জাকারিয়ার মা ভয় পেয়েছিলেন। ব্যাংক লোন মানেই গ্যারান্টার, জমি বন্ধক, দীর্ঘ লাইন, এই ধারণাটা গ্রামের মানুষের মাথায় গভীরভাবে গাঁথা। থাক, মূল কথায় আসি।
ব্র্যাক ব্যাংক এসএমই লোনের জন্য আবেদনকারীর বয়স ১৮ থেকে ৬৫ বছরের মধ্যে হতে হবে, বাংলাদেশের স্থায়ী নাগরিক হতে হবে এবং ব্যবসায় ন্যূনতম ১ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। জাকারিয়ার মা এই তিনটি শর্তই পূরণ করতেন। তাঁর বয়স ৫২ এবং দোকানটি চলছিল প্রায় চার বছর ধরে।
ব্র্যাক ব্যাংক লোন দেওয়ার আগে আবেদনকারীর বেশ কিছু যোগ্যতা যাচাই করে থাকে। জাতীয়তা ও বয়সের দিক থেকে আবেদনকারীকে অবশ্যই জন্মসূত্রে বাংলাদেশি হতে হবে এবং বয়স সাধারণত ২১ থেকে ৬৫ বছরের মধ্যে হতে হয়। লক্ষ করলাম, কিছু সূত্রে ১৮ আবার কিছুতে ২১ বছর বলা হচ্ছে। সততার সাথে বলছি, এই দুটির মধ্যে ব্যাংকটির ইউনিট অফিসে গিয়ে নিশ্চিত হওয়াই ভালো।
| যোগ্যতার বিষয় | স্বাবলম্বী লোনের শর্ত |
|---|---|
| আবেদনকারীর পরিচয় | প্রবাসী কর্মীর পরিবারের সদস্য (বাংলাদেশি নাগরিক) |
| বয়স | ১৮ থেকে ৬৫ বছর |
| ব্যবসার অভিজ্ঞতা | ন্যূনতম ১ বছর |
| লোনের পরিমাণ | ২ লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকা |
| জামানত | প্রয়োজন নেই (জামানতবিহীন) |
ব্র্যাক ব্যাংকের এসএমই লোনে জামানতবিহীন ঋণ সুবিধার কারণে অনেক নতুন উদ্যোক্তা এই পণ্যের মাধ্যমে নিজেদের স্বাবলম্বী করেছেন। এই একটা সুবিধা জাকারিয়ার পরিবারের জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির কারণ হয়েছিল।
লোনের জন্য মনস্থির করার আগে আপনার ব্যবসার এক বছরের আয়-ব্যয়ের একটি সহজ হিসাব খাতায় লিখে রাখুন। আবেদনের সময় এটি কর্মকর্তার সামনে তুলে ধরলে অনুমোদনের গতি বহুগুণ বেড়ে যায়।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহে যে ভুলটা প্রায় সবাই করে
জানেন, বেশিরভাগ আবেদন বাতিল হয় কাগজপত্রের ঘাটতিতে, লোনের যোগ্যতার অভাবে নয়। এটা আমি নিজে দেখেছি জাকারিয়ার পরিবারের ক্ষেত্রেও। তারা প্রথমবার গিয়েছিল, কিছু কাগজ ছিল না। ফিরে আসতে হয়েছিল।
ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবসায়িক লোনের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত ফটোকপি, পাসপোর্ট সাইজের ছবি, ইউটিলিটি বিলের ফটোকপি এবং গত ১২ মাসের ব্যাংক লেনদেনের বিবরণী জমা দিতে হয়। তবে স্বাবলম্বী লোনের জন্য অতিরিক্ত হিসেবে প্রবাসী পরিবার সদস্যের পরিচয় এবং রেমিটেন্স গ্রহণের প্রমাণও প্রয়োজন হতে পারে।
আসলে, একটু অন্যভাবে বলা দরকার। শুধু কাগজ জমা দেওয়াই যথেষ্ট নয়। সাধারণত কাগজপত্র সঠিকভাবে জমা দিলে লোন অনুমোদনের প্রক্রিয়া দ্রুত হয় এবং ১৫ থেকে ২০ কর্মদিবসের মধ্যে অনুমোদন মিলতে পারে। জাকারিয়ার পরিবার দ্বিতীয় চেষ্টায় সব কাগজ নিয়ে গিয়েছিল এবং ১৭ কর্মদিবসের মধ্যে অনুমোদন পেয়েছিল।
| কাগজপত্রের ধরন | বিস্তারিত |
|---|---|
| পরিচয় প্রমাণ | জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত কপি (২ কপি) |
| ছবি | রঙিন পাসপোর্ট সাইজের ছবি (৩ কপি) |
| ঠিকানা প্রমাণ | ইউটিলিটি বিলের ফটোকপি (বিদ্যুৎ/গ্যাস/পানি) |
| ব্যাংক বিবরণী | গত ৬-১২ মাসের লেনদেনের তথ্য |
| ব্যবসার প্রমাণ | ট্রেড লাইসেন্স বা ব্যবসা পরিচালনার প্রমাণ |
| রেমিটেন্স প্রমাণ | প্রবাসী সদস্যের পাসপোর্ট বা রেমিটেন্স রসিদ |
কিছু বিশেষ লোনের ক্ষেত্রে ব্যাংক বিবরণী প্রয়োজন হতে পারে এবং এর বাইরে অতিরিক্ত কিছু প্রয়োজন হলে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা জানিয়ে দেন। এই বিষয়টা অনেকে জানে না। সরাসরি জিজ্ঞেস করাটাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
একটি পরিষ্কার ফাইলে সব কাগজপত্র সাজিয়ে নিন এবং ব্যাংকের ইউনিট অফিসে যাওয়ার আগে হেল্পলাইন ১৬২২১ নম্বরে ফোন করে কোন শাখায় স্বাবলম্বী লোনের কর্মকর্তা আছেন তা নিশ্চিত করুন। এতে অপ্রয়োজনীয় একাধিক যাতায়াত বাঁচবে।
লোনের সুদের হার, পরিশোধ পদ্ধতি ও লুকানো খরচ নিয়ে যা কেউ বলে না
এই বিষয়টা নিয়ে যে কথাটা কেউ বলে না সেটা হলো শুধু সুদের হার দেখলেই হবে না, ঋণের মোট খরচটা বুঝতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত আপনাকে কত টাকা পরিশোধ করতে হবে, সেটাই আসল হিসাব।
ব্র্যাক ব্যাংক তাদের ‘এসএমই মানেই ব্র্যাক ব্যাংক’ প্রচারাভিযানের আওতায় সুদের হার ১৩.৭৫ শতাংশ পর্যন্ত নামিয়ে এনেছে। তবে ২০২৬ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ক্ষুদ্র ব্যবসার এসএমই লোনে সুদের হার সাধারণত ১৫.২৫ থেকে ১৬ শতাংশের মধ্যে থাকে। অর্থাৎ বিশেষ প্রচারমূলক হার এবং স্বাভাবিক হারের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে।
লোন প্রক্রিয়াকরণ ফি হিসেবে লোনের পরিমাণের ০.৫ শতাংশ এবং তার উপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ হয়। আমি ৫ লাখ টাকার লোন বনাম ১০ লাখ টাকার লোনের মোট খরচ তুলনা করলাম এবং পার্থক্যটা অনেকে যা ভাবেন তার চেয়ে কম। বড় লোনে প্রক্রিয়াকরণ ফি শতকরা হিসাবে একই থাকলেও টাকার অঙ্কে বেশি।
দীর্ঘমেয়াদী পরিশোধে মাসিক কিস্তি কম হয় কিন্তু মোট সুদ বেশি দেওয়া লাগে। স্বল্পমেয়াদে মাসিক চাপ বেশি হলেও মোট খরচ কমে। জাকারিয়ার পরিবার ৩ বছরের মেয়াদ বেছে নিয়েছিল। প্রতি মাসে কিস্তি ছিল প্রায় ১৭,০০০ টাকার মতো, যা তাদের মুদিখানার মাসিক মুনাফার মধ্যেই ছিল।
ব্যক্তিগতভাবে আমি ৩ বছরের মেয়াদকে ৫ বছরের চেয়ে এগিয়ে রাখব, মূলত কারণ মোট সুদের বোঝা অনেক কম এবং ব্যবসা একবার দাঁড়িয়ে গেলে দ্রুত পরিশোধ সম্ভব হয়। তবে নিজের ব্যবসার নগদ প্রবাহ বুঝে তারপর সিদ্ধান্ত নিন।
লোন নেওয়ার আগে ব্র্যাক ব্যাংকের ওয়েবসাইটে দেওয়া ইএমআই ক্যালকুলেটর ব্যবহার করুন এবং আপনার ব্যবসার মাসিক লাভের সাথে কিস্তির পরিমাণ মিলিয়ে দেখুন। যদি কিস্তি মাসিক আয়ের ৩০ শতাংশের নিচে থাকে, তাহলে লোন নেওয়া নিরাপদ।
ব্র্যাক ব্যাংকের নেটওয়ার্ক ও মাঠ পর্যায়ের সেবা যেভাবে কাজে এসেছিল
দেখুন না, একটা ব্যাংকের শাখা যদি আপনার গ্রাম থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে হয়, তাহলে সব সুবিধা অর্থহীন। জাকারিয়ার পরিবার থাকে কুমিল্লার একটি ছোট উপজেলায়। তারা সরাসরি ব্যাংকের মূল শাখায় না গিয়ে কাছের এসএমই ইউনিট অফিস থেকেই সব কাজ সেরেছে।
বর্তমানে ব্র্যাক ব্যাংকের সারা দেশে ১৯৬টি শাখা, ৩০টি উপশাখা, ১,০৯৪টি এজেন্ট আউটলেট, ৪৪৭টি এটিএম বুথ এবং ৪৫৭টি এসএমই ইউনিট অফিস রয়েছে। এই বিশাল নেটওয়ার্কই ব্র্যাক ব্যাংককে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।
ব্যাংকটির দেশজুড়ে ৪১টি জোন, ৪৫৭টি অফিস এবং ২,০০০ এরও বেশি কর্মকর্তা এসএমই গ্রাহকদের সেবা দিতে নিয়োজিত। সোজা কথায়, এই অবকাঠামো দেশের যেকোনো প্রত্যন্ত এলাকার পরিবারকেও ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে সক্ষম।
ব্র্যাক ব্যাংক মূলত তার মূল সংগঠন ব্র্যাকের অনুপ্রেরণায় ক্ষুদ্র ঋণ চালু করে প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্যে কাজ করে। এটাই সেই দৃষ্টিভঙ্গি, যা জাকারিয়ার মায়ের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যাংকিংকে আরও সহজ ও আপন করে তোলে।
ব্যাংকটি জামানত ছাড়াই অর্থায়নের সহজ প্রাপ্যতা নিশ্চিত করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রতি তাদের অবিচল প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা নিজেরাই বাড়িতে এসে ব্যবসার অবস্থা যাচাই করেন। এই সেবাটা জাকারিয়ার পরিবার সবচেয়ে উপকারী মনে করেছে।
এই প্রচারাভিযানের অংশ হিসেবে ব্যাংকটি প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের চাহিদার সাথে মিল রেখে দুটি বিশেষ পণ্যও চালু করেছে, যার মধ্যে একটি হলো ‘প্রবর্তন‘ এবং অপরটি ‘বিজপে‘। যারা ই-কমার্স বা ডিজিটাল ব্যবসায় যুক্ত তাদের জন্য এই পণ্যগুলো নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
আপনার এলাকায় ব্র্যাক ব্যাংকের এসএমই ইউনিট অফিস কোথায় তা জানতে ব্যাংকের হেল্পলাইন ১৬২২১ নম্বরে এখনই একটি কল করুন। কাছের অফিস জানা থাকলে লোনের প্রক্রিয়া শুরু করতে আর কোনো বাধা থাকবে না।
লোন পাওয়ার পর জাকারিয়ার পরিবার যেভাবে ব্যবসাটা দাঁড় করিয়েছে
লোন পাওয়াটা শেষ কথা নয়, বরং লোন পাওয়ার পর সেই অর্থটাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোটাই আসল চ্যালেঞ্জ। জাকারিয়ার পরিবার প্রথমে ৩ লক্ষ টাকার একটি এসএমই লোন নিয়েছিল। সেই টাকা দিয়ে তারা মুদির দোকানে নতুন পণ্য যোগ করে, একটি ছোট ফ্রিজ কেনে এবং দোকানঘরটি আরেকটু বড় করে। প্রথম ছয় মাসেই মাসিক আয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়।
ব্র্যাক ব্যাংকের মাঠ কর্মকর্তারা শুধু লোন দিয়েই সরে যাননি। তাঁরা নিয়মিত দোকানে এসে বিক্রয় হিসাব দেখতেন, কীভাবে আরও ভালো করা যায় সে পরামর্শ দিতেন। ব্র্যাক ব্যাংকের একটি বড় শক্তি হলো তাদের মাঠকর্মীরা গ্রাহকের কাছে নিজেরাই যান; ব্যাংকের প্রায় ৩,০০০ জন মাঠকর্মী সরাসরি বাজারে গিয়ে উদ্যোক্তাদের সাথে যোগাযোগ রাখেন। এই সরাসরি সম্পর্কটাই জাকারিয়ার পরিবারের জন্য সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছিল।
প্রথম লোনের কিস্তি সময়মতো শোধ করার পর জাকারিয়ার মা দ্বিতীয়বার আরও বড় অঙ্কের লোনের জন্য আবেদন করেন। এবার তিনি ৭ লক্ষ টাকা পান, যা দিয়ে পাশের ঘরে একটি কাপড়ের দোকান খোলা হয়। ব্র্যাক ব্যাংকের এসএমই অর্থায়নের প্রভাব পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ব্যাংকটি তার ক্ষুদ্র ব্যবসা অর্থায়নের মাধ্যমে ১৫ লক্ষেরও বেশি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করেছে এবং ঋণগ্রহীতাদের জীবনমানের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। জাকারিয়ার পরিবারও ঠিক এভাবেই এলাকার দুইজন মানুষকে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে।
ব্র্যাক ব্যাংকের একটি বড় এসএমই ঋণের গড় আকার মাত্র ১৬ থেকে ১৮ লক্ষ টাকা। একজনকে বড় অঙ্ক না দিয়ে অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার মধ্যে ঋণ ছড়িয়ে দেওয়ার এই কৌশলে ঝুঁকি কম থাকে এবং অসংখ্য নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হয়। জাকারিয়ার পরিবারের গল্পটাও এই বৃহত্তর চিত্রেরই একটি ছোট্ট কিন্তু জীবন্ত টুকরো।
শেষ কথা
২৪ বছরের পথচলায় ব্র্যাক ব্যাংক ২০ লক্ষ এসএমই গ্রাহককে সেবা দেওয়ার মাইলফলক অর্জন করেছে এবং সারা দেশের এসএমই উদ্যোক্তাদের কাছে মোট ২ লক্ষ কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ করেছে, যা ২ কোটি মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। জাকারিয়ার মায়ের মতো লক্ষ লক্ষ প্রান্তিক উদ্যোক্তার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার এই যাত্রা প্রমাণ করে যে সঠিক আর্থিক সহায়তা পেলে সাধারণ মানুষও অসাধারণ কিছু করতে পারেন।
ব্র্যাক ব্যাংক তাদের ‘এসএমই মানেই ব্র্যাক ব্যাংক’ প্রচারণার অধীনে জামানতবিহীন ঋণের সুদের হার ১৩.৭৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছে, যা বাংলাদেশের সিএমএসএমই অর্থায়ন খাতে সর্বনিম্ন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে যারা এখনো ব্যাংকিং সেবার বাইরে আছেন, তারাও নিজেদের ব্যবসার স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে আসতে পারেন। একটি ফোনকল বা কাছের এসএমই অফিসে একটি ভিজিটই হতে পারে আপনার জীবন বদলে দেওয়ার প্রথম পদক্ষেপ।
ব্র্যাক ব্যাংক প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করে একটি টেকসই ব্যবসায়িক মডেল গড়ে তুলেছে, যা শুধু ব্যাংকের মুনাফা নয়, দেশের কোটি মানুষের জীবিকার চাকাকেও সচল রাখছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সাফল্যই এই ব্যাংকের সবচেয়ে বড় পুরস্কার আর সেই সাফল্যের গল্প প্রতিদিন নতুনভাবে লেখা হচ্ছে বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি বাজারে।

