করিম চাচা যেভাবে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক থেকে কৃষি ঋণ নিলেন: কেস স্টাডি
করিম চাচা নওগাঁর একজন কৃষক। জমি থাকলেও ধান চাষের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন তার হাতে ছিল না। পাড়ার একজনের পরামর্শে তিনি রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের শরণাপন্ন হন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে ঋণের আবেদন করার পর তিনি কৃষি ঋণ পান এবং সময়মতো চাষাবাদ শুরু করতে সক্ষম হন।
এটি শুধু করিম চাচার গল্প নয়, বরং উত্তরবঙ্গের অসংখ্য কৃষকের বাস্তবতা। এই কেস স্টাডিতে আমরা করিম চাচার অভিজ্ঞতার মাধ্যমে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক থেকে কৃষি ঋণ পাওয়ার পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানব।
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক কী এবং করিম চাচা কেন এটিই বেছে নিলেন
সোজা কথায় বলতে গেলে, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) ১৯৮৭ সালের ১৫ মার্চ কার্যক্রম শুরু করে এবং এটি দেশের একমাত্র বিশেষায়িত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক যার প্রধান কার্যালয় ঢাকার বাইরে রাজশাহীতে অবস্থিত। এই তথ্যটা কিন্তু অনেকেই জানেন না।
করিম চাচা প্রথমে বেসরকারি একটি সংস্থায় যাওয়ার কথা ভেবেছিলেন। সুদ ছিল ২০ শতাংশের উপরে। সুদের পরিমান শুনে করিম চাচার অবাক লাগলো। তারপর চাচা তাঁরই গ্রামের একজনের মাধ্যমে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) কথা জানলেন। রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঋণ সুদের হার মাত্র ৯ শতাংশ। এই পার্থক্যটা ছিল প্রায় ১১ শতাংশ, যা একজন ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য বিশাল।
বাংলাদেশে বিশেষায়িত ব্যাংক মাত্র তিনটি: বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক। অর্থাৎ কৃষকদের জন্য বিকল্প হাতে গোনা। তবে উত্তরবঙ্গের মানুষের জন্য রাকাব সবচেয়ে কাছের।
বেশিরভাগ লেখায় বলা হয় যে সরকারি ব্যাংকে ঋণ পেতে অনেক ঝামেলা। আমি একমত নই, কারণ রাকাবের কাঠামো মূলত কৃষকবান্ধব করেই তৈরি। বার্ষিক ঋণ বিতরণ লক্ষ্যমাত্রার ৬০ শতাংশই শস্য খাতে বিতরণ করা হয়। এই সংখ্যাটি বলে দেয়, প্রতিষ্ঠানটির মূল ফোকাস কোথায়।
করিম চাচার মতো মানুষ, যার বেশি পড়ালেখা নেই কিন্তু জমি আছে, তার জন্য রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক আসলে সবচেয়ে স্বাভাবিক পছন্দ। ব্যক্তিগতভাবে আমি রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংককে অন্য সরকারি ব্যাংকগুলোর চেয়ে এগিয়ে রাখব, মূলত কারণ এর শাখা নেটওয়ার্ক উত্তরবঙ্গের গ্রামপর্যায়ে ছড়িয়ে আছে।
কাজের পরামর্শ: আপনি যদি উত্তরবঙ্গের কৃষক হন এবং ঋণের কথা ভাবছেন, তাহলে আজই নিকটস্থ রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের শাখায় গিয়ে শুধু একবার খোঁজ নিন। পনের মিনিটের কথাবার্তায় আপনি বুঝতে পারবেন আপনি যোগ্য কিনা।
করিম চাচার আবেদন প্রক্রিয়া: ধাপে ধাপে যা হলো
আচ্ছা ধরুন, আপনি প্রথমবার ব্যাংকে যাচ্ছেন। ঘাবড়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। করিম চাচাও ঘাবড়েছিলেন, কারণ এর আগে কোনদিন তিনি ব্যাংকে আসেনি। তবে গিয়ে দেখলেন ব্যাপারটা তিনি বাহিরে যতটা জটিল ভেবেছিলেন, ততটা জটিল নয়।
কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের প্রক্রিয়ার প্রধান ধাপগুলো হলো ঋণ গ্রহণের যোগ্যতা যাচাই, ঋণের ধরন ও পরিমাণ নির্ধারণ, আবেদন প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা এবং ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ। এই পাঁচটি ধাপ মাথায় রাখলে পুরো বিষয়টা অনেক সহজ হয়ে যায়।
করিম চাচা প্রথমে গেলেন স্থানীয় রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের শাখায়। প্রথমে তিনি শাখা ব্যবস্থাপকের সঙ্গে কথা বললেন। শাখা ব্যবস্থাপক তাঁকে জানালেন তিনি শস্য ঋণের জন্য যোগ্য। এরপর আবেদনপত্র নিলেন। ঋণ প্রার্থীরা নিকটস্থ শাখায় গিয়ে আবেদন ফর্ম পূরণ করতে পারেন এবং অনলাইনেও আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। তবে করিম চাচা সরাসরি শাখায় গিয়েই কাজ সারলেন, কারণ তিনি সশরীরে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
থাক, মূল কথায় আসি। সবচেয়ে জরুরি ছিল কাগজপত্র। ঋণ গ্রহণের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, জমির কাগজপত্র, পাসপোর্ট সাইজ ছবি এবং পূর্ববর্তী ঋণের তথ্য (যদি থাকে) জমা দিতে হয়। করিম চাচার জমির পর্চা ছিল, ভোটার আইডি ছিল। ছবি তুলিয়ে নিলেন সেখানকার বাজার থেকে।
আসলে, একটু অন্যভাবে বলা দরকার। করিম চাচা যেটা বলেছিলেন, সেটা খুব কাজের কথা “ব্যাংকে যাওয়ার আগে কাগজগুলো গুছিয়ে নাও। না হলে একই কাজের জন্য দুইবার ব্যাংকে যেতে হবে।” একদম ঠিক কথা। কাগজপত্রগুলো সঠিকভাবে জমা না দিলে ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হতে পারে।
কাজের পরামর্শ: ব্যাংকে যাওয়ার আগে একটি ফাইলে সব কাগজের মূলকপি ও ফটোকপি আলাদা করে রাখুন। এই একটি অভ্যাসই আপনার আবেদন প্রক্রিয়া দ্রুত করে দেবে, কোনো সন্দেহ নেই।
ঋণের ধরন ও পরিমাণ: করিম চাচা কোন ধরনের ঋণ বেছে নিলেন এবং কেন
এটা নিয়ে আমি নিজেও একটু ভেবেছিলাম। রাকাব কোন কোন ধরনের ঋণ দেয়? শুধু ধান-পাটের ঋণ, নাকি আরও বিস্তৃত? জানা গেল, বিস্তৃতিটা অনেক বেশি।
| ঋণের ধরন | খাত | বিশেষ সুবিধা |
|---|---|---|
| শস্য ঋণ | ধান, গম, ভুট্টা | বার্ষিক লক্ষ্যের ৬০% এই খাতে |
| রেয়াতী সুদে ঋণ | ডাল, তৈলবীজ, মসলা, ভুট্টা | মাত্র ৪% সুদে |
| ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ঋণ | কৃষি ও কৃষি-বহির্ভূত | সর্বোচ্চ পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত |
| এসএমই ঋণ | ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা | সামগ্রিক আর্থিক বিকাশ লক্ষ্যে |
| বিশেষ কর্মসূচি ঋণ | পেশাভিত্তিক জনগোষ্ঠী | সামাজিক দায়বদ্ধতার আওতায় |
করিম চাচা বেছে নিলেন শস্য ঋণ। কারণ তিনি বোরো ধান চাষ করবেন। আমদানি বিকল্প ডাল, তৈলবীজ, মসলাজাতীয় ফসল ও ভুট্টা চাষে ৪ শতাংশ রেয়াতী সুদে ঋণ বিতরণ করা হয়। এই তথ্যটা কিন্তু অনেকেই জানেন না। যদি করিম চাচা ডাল বা সরিষা করতেন, তাহলে আরও কম সুদে ঋণ পেতেন।
ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি রেয়াতী সুদের ঋণটাকে এগিয়ে রাখা উচিত, কারণ ৪ শতাংশ সুদ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অসাধারণ একটি সুযোগ। অথচ বেশিরভাগ কৃষক শুধু ধান-পাটের দিকেই ঝুঁকে থাকেন।
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক কৃষকদের জন্য বিভিন্ন ধরনের ক্ষুদ্র ঋণ সুবিধা প্রদান করে, যার মধ্যে কিছু ঋণ প্রকল্পে কোনো ধরনের স্থাবর জামানতের প্রয়োজন হয় না। বিষয়টি অনেকের কাছে অবাক লাগলেও এটি বাস্তব। তবে জামানতবিহীন ঋণ পেলেও আবেদনকারীকে নির্ধারিত যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং ব্যাংকের শর্তাবলি পূরণ করতে হয়।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্রকল্পে উদ্যোক্তা প্রতি সর্বোচ্চ ঋণের পরিমাণ পাঁচ লক্ষ টাকা এবং মহিলা উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তার মানে নারী কৃষকরা এখানে বিশেষ সুবিধা পান।
কাজের পরামর্শ: ঋণ নেওয়ার আগে নির্দিষ্ট করুন আপনি কোন ফসল চাষ করবেন। যদি সরিষা, মসুর বা মসলা জাতীয় ফসলের পরিকল্পনা থাকে, তাহলে শাখা ব্যবস্থাপককে সেটা জানান। ৪ শতাংশ রেয়াতী সুদের সুবিধা নেওয়ার এই সুযোগ অনেকেই মিস করেন।
রাকাবের শাখা নেটওয়ার্ক ও ২০২৬ সালের হালনাগাদ সুবিধাসমূহ
করিম চাচার বাড়ি থেকে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের শাখা মাত্র চার কিলোমিটার দূরে। এটা কাকতালীয় নয়। বর্তমানে ব্যাংকটির রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে দুটি বিভাগীয় কার্যালয়, ১৮টি জোনাল কার্যালয়, উপজেলা পর্যায়ে ৬০টি এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে ৩০৮টি গ্রামীণ শাখাসহ মোট ৩৮৪টি শাখা আছে। এই বিস্তার দেখলেই বোঝা যায় প্রতিষ্ঠানটি এই দুই বিভাগে কতটা প্রভাব বিস্তার করে তার কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ইতিমধ্যে ISO 27001:2022 সার্টিফিকেশন অর্জন করেছে এবং “ই-গভর্ন্যান্স ও উদ্ভাবন কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে” রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংক ক্যাটাগরিতে প্রথম স্থান অর্জন করেছে। এটা বলছে ২০২৬ সালে এসে ব্যাংকটি ডিজিটাল দিক থেকেও এগিয়ে গেছে। শুধু মাঠের ব্যাংক নয়, এখন এটি প্রযুক্তিগতভাবেও নিরাপদ।
আশ্চর্য না? একটি কৃষিঋণের ব্যাংক আন্তর্জাতিক তথ্য-নিরাপত্তা সনদ পেয়েছে। অর্থাৎ আপনার তথ্য সুরক্ষিত।
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ই-ব্যাংকিং মোবাইল অ্যাপও চালু হয়েছে। করিম চাচা এটা ব্যবহার করতে পারেন না। কিন্তু তাঁর ছেলে ব্যবহার করেন। ঋণের কিস্তির খোঁজ রাখেন এই অ্যাপ থেকেই।
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধনের পরিমাণ ১০০০ কোটি টাকা ও পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ৮২৫ কোটি টাকা। এই আর্থিক ভিত্তি বলছে ব্যাংকটি দুর্বল নয়। তাদের ঋণ দেওয়ার সম্পূর্ণ সক্ষমতা আছে।
সততার সাথে বলতে হয়, এই ব্যাংকের ডিজিটাল পরিষেবা এখনো শহরের মানুষদের জন্য যতটা সহজ, গ্রামের বয়স্ক কৃষকদের জন্য ততটা নয়। তবুও ব্যাংকের শাখার উপস্থিতি যেভাবে গ্রামপর্যায়ে আছে, সেটাই আপাতত অনেক বড় শক্তি।
কাজের পরামর্শ: রাকাবের ওয়েবসাইট www.rakub.org.bd থেকে আপনার উপজেলার শাখার ঠিকানা ও ফোন নম্বর বের করুন। শাখায় যাওয়ার আগে একবার ফোন করে শাখা ব্যবস্থাপকের সময় নিয়ে রাখুন। এতে অনেকটাই সময় বাঁচবে।
ঋণ অনুমোদন থেকে টাকা হাতে পাওয়া: করিম চাচার বাস্তব অভিজ্ঞতা
করিম চাচা ঋণের জন্য আবেদন করলেন। তারপর কী হলো? আসলে এই অংশটাই সবচেয়ে বেশি মানুষের আগ্রহের বিষয়। আবেদন জমা দেওয়ার পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তার তথ্য, জমির অবস্থা এবং ঋণের উদ্দেশ্য যাচাই করে। সবকিছু ঠিক থাকলে ঋণ অনুমোদন করা হয় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তার হাতে ঋণের অর্থ তুলে দেওয়া হয়। ঠিক এই ধাপগুলোই আমরা এখন বিস্তারিতভাবে জানব।
আবেদন জমা দেওয়ার পর শাখা কর্মকর্তা মাঠ পরিদর্শনে এলেন। জমি দেখলেন, মাপলেন। করিম চাচার ৩ বিঘা জমি আছে। সেই অনুযায়ী ঋণের পরিমাণ নির্ধারিত হলো। পুরো অনুমোদন প্রক্রিয়ায় সময় লাগল প্রায় দুই সপ্তাহ।
ঋণ পরিশোধ কিস্তিতে করতে হয় এবং কিস্তির সংখ্যা ও পরিমাণ সাধারণত ঋণের পরিমাণ ও সময়সীমার উপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। করিম চাচার ক্ষেত্রে মাসিক কিস্তির ব্যবস্থা হলো, যেটা ফসল তোলার পর পরিশোধ করার সুযোগ দেওয়া হয়।
আগাম পরিশোধের সুবিধাও রয়েছে এবং এটি করার মাধ্যমে সুদের পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব। করিম চাচা ধান বিক্রির পর অথবা ইচ্ছা করলে আগেই ঋণ শোধ করতে পারবেন।
এখন যে কথাটা কেউ বলে না সেটা হলো: ঋণ অনুমোদনে সবচেয়ে বড় বাধা হয় কাগজ-পত্রের ঘাটতি নয়, বরং মাঠ পরিদর্শনের সময়ের সঙ্গে কৃষকের সময় না মেলা। কারণ কর্মকর্তারা সাধারণত কর্মদিবসে আসেন, কিন্তু কৃষক তখন মাঠে থাকেন। এই সময়ের সমন্বয়টা আগে থেকে করা দরকার।
দারিদ্র বিমোচন ও কর্মসংস্থান মূলক কার্যক্রমে অর্থায়নের উপর ব্যাংক বিশেষ গুরুত্বারোপ করে এবং সাম্প্রতিক সময়ে এসএমই ও বিশেষ ঋণ কর্মসূচির আওতায় কৃষি-বহির্ভূত খাতেও অর্থায়ন করা হচ্ছে। অর্থাৎ শুধু চাষাবাদ নয়, গ্রামীণ উদ্যোক্তারাও এই সুবিধার আওতায় আসতে পারেন।
কাজের পরামর্শ: ঋণের আবেদন জমা দেওয়ার পরে শাখা কর্মকর্তাকে আপনার মোবাইল নম্বর দিন এবং মাঠ পরিদর্শনের তারিখটা আগেই ঠিক করুন। এই একটা পদক্ষেপ অনুমোদন প্রক্রিয়া ৩ থেকে ৫ দিন এগিয়ে দিতে পারে।
করিম চাচার ঋণের ফলাফল এবং অন্য কৃষকরা যা ভুল করেন
করিম চাচা ঋণের টাকা হাতে পেয়ে সার কিনলেন, সেচের খরচ মেটালেন এবং সময়মতো চাষাবাদ সম্পন্ন করলেন। ফলাফলও ছিল আশাব্যঞ্জক বোরো ধানের ভালো ফলন হলো। ফসল বিক্রি করে তিনি ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধ করলেন। তাহলে কি গল্প এখানেই শেষ? না, বরং এখান থেকেই শুরু হলো তার আর্থিক স্বাবলম্বিতার নতুন অধ্যায়। সফলভাবে ঋণ পরিশোধ করার ফলে ভবিষ্যতে আরও সহজে অর্থায়ন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলো এবং তার কৃষিকাজের পরিধিও ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করল।
সত্যিকার অর্থে গল্পটা শুরু হয় এখান থেকে। কারণ করিম চাচা এরপর দ্বিতীয়বার ঋণের জন্য গেলে তাঁকে অনুমোদন পেতে অনেক কম সময় লাগল। ব্যাংকের সঙ্গে একটি বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এটাই আসল পুঁজি করিম চাচার জন্য।
কিন্তু অনেক কৃষক যে ভুলটা করেন, সেটা হলো কিস্তি বাকি রাখা। রাকাব ২০২৬ সালের মার্চ মাসে ত্রৈমাসিক ঋণ শ্রেণীবিন্যাস ও প্রভিশনিং কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। যেসব: ঋণ নিয়মিত পরিশোধ হয় না, সেগুলো শ্রেণীবদ্ধ হয়ে যায়। একবার খেলাপি তালিকায় গেলে পরবর্তী ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
যে কথাটা কেউ বলে না: অনেক কৃষকঋণ নেওয়ার পর কিস্তির তারিখ ডায়েরিতে লিখে রাখেন না। ফসল বিক্রির টাকা হাতে আসে, কিন্তু অন্য খরচে সেটা চলে যায়। তারপর কিস্তির দিন আসে এবং টাকা থাকে না। এই ছোট্ট ভুলটাই একটি পরিবারের পরবর্তী দুই-তিন বছরের ঋণ প্রাপ্তির সুযোগ বন্ধ করে দিতে পারে।
কাজের পরামর্শ: ফসল বিক্রির পরপরই কিস্তির টাকাটা আলাদা করে রাখুন এমনকি যদি কিস্তির তারিখ আরও এক মাস পরেও হয়। ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রাখলে সবচেয়ে ভালো, কারণ তাতে শেষ মুহূর্তের বিপদ এড়ানো যায়।
শেষ কথা
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক শুধু একটি ব্যাংক নয়, এটি উত্তরবঙ্গের কৃষি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। ব্যাংকটি গ্রামীণ ক্ষুদ্র সঞ্চয় সংগ্রহে বিশেষ গুরুত্ব দেয় এবং দশ লক্ষেরও বেশি গ্রাহককে সেবা প্রদান করে আসছে। করিম চাচার মতো লক্ষ লক্ষ কৃষক এই ব্যাংকের মাধ্যমে তাঁদের জমি চাষের স্বপ্ন পূরণ করতে পারছেন। কিন্তু সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি দায়িত্বটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ সময়মতো কিস্তি পরিশোধ করলে ব্যাংকের সঙ্গে যে বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হয়, সেটাই আগামী দিনে সবচেয়ে বড় সম্পদ।
কৃষি ঋণে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন প্রকল্পের আওতায় সুদের হার ৭ থেকে ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়, যা কৃষিকাজে বা কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণে নিযুক্ত একজন ঋণগ্রহীতাকে অন্য খাতের তুলনায় অনেক কম সুদে ঋণ পেতে সাহায্য করে। এই সুযোগটা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হলে দরকার সচেতনতা, সঠিক কাগজপত্র এবং শাখা কর্মকর্তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ। তথ্যের অভাবে অনেক যোগ্য কৃষক এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত থেকে যান এই লেখাটি সেই শূন্যস্থান কিছুটা হলেও পূরণ করতে পারলে উদ্দেশ্য সফল।
সবশেষে মনে রাখবেন ঋণ একটি হাতিয়ার, বোঝা নয়। সঠিক পরিকল্পনায় নেওয়া এবং সময়মতো পরিশোধ করা ঋণ একজন কৃষকের জীবনমান বদলে দিতে পারে, তাঁর সন্তানের লেখাপড়ার পথ খুলে দিতে পারে এবং আগামী মৌসুমের জন্য আরও শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে পারে। রাকাব ইতিমধ্যে আইএসও ২৭০০১:২০২২ সার্টিফিকেশন অর্জন করেছে এবং ই-গভর্ন্যান্স ও উদ্ভাবন কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংক ক্যাটাগরিতে প্রথম স্থান অর্জন করেছে অর্থাৎ এই ব্যাংক প্রযুক্তি ও স্বচ্ছতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে কৃষকদের সেবা আরও সহজ করবে।

